কেদারনাথ মজুমদার

জ্ঞানীপিডিয়া থেকে
কেদারনাথ মজুমদার
কেদারনাথ মজুমদার.jpg
জন্ম২৬ জ্যৈষ্ঠ ১২৭৭ (১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ)
কাপাসাটিয়া, কিশোরগঞ্জ (মাতুলালয়)
মৃত্যু৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩ (১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ)

কেদারনাথ মজুমদার একজন ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

প্রাথমিক ও শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

তিনি ১২৭৭ বঙ্গাব্দের ২৬ জ্যেষ্ঠ (ইংরেজি ১৮৭০) কিশোরগঞ্জ জেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম লোকনাথ মজুমদার ও মাতার নাম জয়দুর্গা দেবী।

কেদারনাথ মজুমদারের পড়ালেখা শুরু হয় তার নিজ গ্রামের বিদ্যালয়ে। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ময়মনসিংহ শহরে যান। সেখানে তিনি নাসিরাবাদ এক্টাস স্কুলে ভর্তি হন। পরে ময়মনসিংহ শহর বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৮৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হন। এ বিদ্যালয় থেকে তিনি ১৮৮৯ সালে এট্রাস পাশ করেন।

চাকরী জীবন[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

পরিবার চালানোর জন্য তিনি ময়মনসিংহ জেলা ম্যাজিস্টেট অফিসের ফৌজদারি থানায় নকলনবীশের চাকরি নেন। তার মামা কৃষ্ণকুমার রায় তাকে এ চাকরিটির ব্যবস্থা করে দেন। এই চাকরির উপর নির্ভর করে তিনি সাহিত্য চর্চাও করেছেন। সাহিত্য চর্চার খরচ যোগানের জন্য চাকরির পাশাপাশি পাঠ্য বই প্রণয়ন মানচিত্র প্রকাশ ও ছাপখানা পরিচালনা ইত্যাদি কাজ করেছেন। চাকরি জীবনে তিনি একসময় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯০১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।

সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জীবন[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

তার সাহিত্যিক জীবনের শুরু হয় তার নিজ বাড়ি থেকেই। তার বাবা-মার অনুপ্রেরণা থেকে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হন। নাসিরাবাদ বিদ্যালয়ের প্রধান পণ্ডিত বেদজ্ঞ উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছ থেকে শাস্ত্র ও পুরাণনুশীলনে আগ্রহী হন। ময়মনসিংহ জিলা বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রীনাথ চন্দ্র তাকে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ জাগান। তিনি ময়মনসিংহ জিলা বিদ্যালয়ে 'মনোরঞ্জিকা ক্লাব'-এ সাহিত্য চর্চা করতেন।

বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি তার প্রথম উপন্যাস 'স্রোতের ফুল' রচনা করেন।

চাকরি অবস্থায় নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েও তিনি সাহিত্যচর্চা করেন। এক সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্য কলকাতা যান। সেখানেও তিনি সাহিত্য চর্চা করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন রকমের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ পাঠ সংগ্রহ করতেন ও হাতে লিখে নিতেন।

কেদার নাথ মজুমদার একাধিক পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন। সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন।

১২৯৫ বঙ্গাব্দেের বৈশাখ মাসে সাতাশ বছর বয়সে তিনি কুমার নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। যেটি ১২৯৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা থেকে শ্রাবণ সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশ হয়। কুমার পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বাসনা নামে আরেকটি পত্রিকা চালু করেন। এরপর তিনি আরতি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৩১৯ বঙ্গাব্দের কার্তিকে তিনি সৌরভ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর পূর্বে তিনি 'সম্মিলন' নামে একটি পত্রিকার পরিচালক নিযুক্ত হয়েছিলেন, যার জন্য তিনি ঢাকাতে কিছুদিন বসবাস করেন।

সৌরভ পত্রিকাটি প্রথমে পুস্তাকারে প্রকাশ হয়, পরবর্তীতে তিনি একে ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশ করেন। এখানে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন, স্বভাব কবি গোবিন্দ দাস, চন্দ্রকুমার দে ও সৌরভ কুমার রায়সহ নামকরা কবি-সাহিত্যিকগণ লিখতেন। স্থানীয় কবি ও লেখকদের জন্য তিনি ‘সৌরভ সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সৌরভ পত্রিকাটি ১৩০০ বঙ্গাব্দের পর বন্ধ হয়ে যায়। ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি ময়মনসিংহে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন গবেষণা ঘর এবং পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন সৌরভ প্রেস।

১৩১০ বঙ্গাব্দে তিনি ময়মনসিংহ সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে তার উদ্যোগে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন।

কেদারনাথ মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে ময়মনসিংহ শহরে ১৯১৭ সালে ‘জয়দুর্গা এম.ই স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তী সময়ে হাইস্কুলে উন্নীত হয় এবং ‘জয়দুর্গা ইনস্টিটিউশন’ নামে পরিচিত হয়। এ ছাড়া তিনি মায়ের নামে নিজ গ্রামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্যোগে ময়মনসিংহ শহরে ‘সাহিত্য সভা’ স্থাপিত হয়।

গ্রন্থ[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

তিনি 'ময়মনসিংহরে ইতিহাস' নামে একটি আঞ্চলিক ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন যা একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ১৯০৪ সালে 'ময়মনসিংহের বিবরণ' প্রকাশ করেন এবং ১৯০৭ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন। ময়মনসিংহরে ইতিহাস' ও ময়মনসিংহরের বিবরণ" রচনা করে তিনি ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ময়মনসিংহের কাহিনী ও ময়মনসিংহ পল্লী বিবরণ নামে দুটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

১৯১০ সালে তিনি 'ঢাকার বিবরণ' রচনা করেন। এছাড়া তিনি 'ফরিদপুরের বিবরণ' নামেও একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৯১৫ সালে 'সারমত কুণ্ডা' নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেন।

তিনি জীবনে চারটি ডপন্যাস রচনা করেছিলেন। বিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় ১৮৮৮ সালে স্রোতের ফুল উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন, পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে তা প্রফুল্ল নামে প্রকাশ করেন। ১৩৩০ বঙ্গাব্দে তিনি শুভদৃষ্টি উপন্যাস এবং ১৩৩১ বঙ্গাব্দে ‘সমস্যা’ উপন্যাস প্রকাশ করেন। তিনি 'দস্যুর মহত্ত্ব', 'স্বপ্ন' ও 'ঋণ পরিশোধ' নামে তিনটি ক্ষুদ্র উপন্যাসও লিখছিলেন ও এই তিনটি উপন্যাসকে একত্র করে ১৯০৬ সালের জুলাই মাসে 'চিত্র' নামের একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস প্রকাশ করেন।

তার লিখিত উল্লেখযোগ্য রচনাবলি হল:

  • ময়মনসিংহের ইতিহাস (১৩১২ বঙ্গাব্দ)
  • ঢাকার বিবরণ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ)
  • সাময়িক সাহিত্য (১৩২৪ বঙ্গাব্দ)
  • রামায়ণের সমাজ (১৯২৭)
  • শুভদৃষ্টি (১৩৩০ বঙ্গাব্দ)
  • সমস্যা (১৩৩১ বঙ্গাব্দ)
  • গদ্য সাহিত্য (১৯০১)
  • চিন্তা (১৩১৩ বঙ্গাব্দ)
  • ময়মনসিংহ সহচর (১৯০৮)
  • ময়মনসিংহের বিবরণ (১৩১১ বঙ্গাব্দ) ইত্যাদি

রামায়ণ নিয়ে গবেষণা[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

তিনি ১৩১০ বঙ্গাব্দ থেকে সনাতন (হিন্দু) ধর্মের গ্রন্থ 'রামায়ণ' মহাকাব্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি রামায়ণকে একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতান্ত্রিক গ্রন্থ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। রামায়নের উপর গবেষণাস্বরূপ তিনি 'রামায়ণ সমাজ' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেটি তার মৃত্যুর দুই বছর পর প্রকাশ হয়।

মৃত্যু[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

সারাজীবন শোক, অশান্তি ও ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করে কেদারনাথ সাহিত্য চর্চা চালিয়ে গেছেন। রামায়ণ সমাজ' গ্রন্থটি রচনা করার সময় কেদারনাথ মজুমদার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ এই স্থিতধী পুরুষের জীবনাবসান হয় ১৩৩৩ (১৯২৬) বঙ্গাব্দের ৬ই জ্যৈষ্ঠ। তিনি ময়মনসিংহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷

<ref>http://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0%2C_%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%A5</ref>==তথ্যসূত্র==

<references group=""></references>

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

উইকিসংকলন
উইকিসংকলন-এ এই লেখকের লেখা মূল বই রয়েছে:
  • {{বাংলাপিডিয়া}} টেমপ্লেটে আইডি অনুপস্থিত ও উইকিউপাত্তেও তা উপস্থিত নেই।